শুক্রবার,

০৪ এপ্রিল ২০২৫,

২১ চৈত্র ১৪৩১

শুক্রবার,

০৪ এপ্রিল ২০২৫,

২১ চৈত্র ১৪৩১

Radio Today News

বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করলেন ট্রাম্প, বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘ঝড়ের আভাস’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭:৩৬, ৩ এপ্রিল ২০২৫

Google News
বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করলেন ট্রাম্প, বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘ঝড়ের আভাস’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। কার্যত প্রায় সব দেশের ওপর আরোপ করা এই শুল্ক বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এই ঘোষণাকে অনেকে ট্রেড ওয়ার বা শুল্ক যুদ্ধের সূচনা হিসেবে দেখছেন। এটি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই শুল্ক মার্কিন শিল্পকে রক্ষা করবে এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে দেশীয় কর্মসংস্থান বাড়াবে। শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা দ্রুত বাড়বে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, আমরা আর বিদেশি দেশগুলোর কাছে আমাদের বাজারকে জিম্মি হতে দেব না। এটি আমেরিকার জন্য একটি নতুন শুরু।

তবে এই সিদ্ধান্তের পরপরই কানাডা, মেক্সিকো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি নতুন সংকটের আভাস দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব

এই শুল্কযুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমদানি পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। ফলে ভোক্তাদের জীবনযাত্রার খরচের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে।

একই সঙ্গে কানাডা ও মেক্সিকোর মতো প্রতিবেশী দেশগুলো, বিশেষ করে যারা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল - তাদের রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হতে পারে।

চীনের ক্ষেত্রে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। চীন ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, তারাও মার্কিন কৃষিপণ্য ও শক্তি খাতের ওপর প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করবে।

এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স ও অটোমোবাইল শিল্প, ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে।

বাণিজ্য ও শিল্পে প্রভাব

কানাডা এই শুল্ককে 'অগ্রহণযোগ্য' আখ্যা দিয়ে বলেছে, আমরা ১০৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর ২৫% শুল্ক আরোপ করব। মেক্সিকোও একই পথে হাঁটছে, যার ফলে উত্তর আমেরিকার সমন্বিত অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও মার্কিন মোটরসাইকেল, হুইস্কি এবং জিন্সের মতো পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেইন এই শুল্ককে 'বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় আঘাত' বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, আমদানির ওপর নতুন শুল্ক আরোপের কারণে অনিশ্চয়তা বাড়বে, যা বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনবে।

সবচেয়ে দুর্বল দেশগুলোর ওপর এর প্রভাব কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভন ডার লেইন উল্লেখ করেন, এখন সেই ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে।

এই প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের পরিমাণ হ্রাস পাবে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিয়েছেন, এটি ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার সময়কার সংরক্ষণবাদী নীতির পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে। বৈশ্বিক শিল্প যেমন ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং কৃষি খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রাজনৈতিক টানাপড়েন

শুল্ক ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সম্পর্কে ফাটল দেখা দিয়েছে। কানাডা ও মেক্সিকোর নেতারা এটিকে 'বন্ধুত্বের প্রতি আঘাত' হিসেবে দেখছেন।

এদিকে, চীন এই সুযোগে বিশ্ব বাণিজ্যে নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। অনেকে মনে করছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের অবস্থানকে আরও দুর্বল করবে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) এই পরিস্থিতিতে ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো ইতিমধ্যে এই সংস্থায় মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় তাৎক্ষণিক সমাধানের সম্ভাবনা কম।

এদিকে, শুল্ক ঘোষণার পর বিশ্বব্যাপী শেয়ার বাজারেও তীব্র পতন দেখা গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে ডাও জোন্স সূচক ৫০০ পয়েন্ট কমেছে। সেই সঙ্গে টরন্টো ও মেক্সিকো সিটির বাজারও ধস নেমেছে। কানাডিয়ান ডলার এবং মেক্সিকান পেসোর মান কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু দেশে সাধারণ মানুষের জন্য এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে পড়তে পারে। বিশেষ করে গাড়ি, ইলেকট্রনিক্স এবং খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে, যা জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি করবে।

একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে এই শুল্ক যুদ্ধ বৈশ্বিক মুক্ত বাণিজ্যের পরিবর্তে সংরক্ষণবাদী নীতির দিকে ঝুঁকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমলেও অন্য দেশগুলো বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকলে, বৈশ্বিক মার্কিন প্রভাব কমে যেতে পারে। শুল্ক যুদ্ধের এই প্রথম ধাপের পরবর্তী ফলাফল নির্ভর করবে আগামী দিনে দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া ও কৌশলের ওপর।

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের