সোমবার,

৩১ মার্চ ২০২৫,

১৭ চৈত্র ১৪৩১

সোমবার,

৩১ মার্চ ২০২৫,

১৭ চৈত্র ১৪৩১

Radio Today News

গণপ্রজাতন্ত্রী চীন এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের যৌথ প্রেস বিজ্ঞপ্তি

রেডিওটুডে রিপোর্ট

প্রকাশিত: ২৩:১৬, ২৮ মার্চ ২০২৫

আপডেট: ২৩:১৭, ২৮ মার্চ ২০২৫

Google News
গণপ্রজাতন্ত্রী চীন এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের যৌথ প্রেস বিজ্ঞপ্তি

বোয়াও এশিয়া ফোরামের মহাসচিবের আমন্ত্রণে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বোয়াও এশিয়া ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন ২০২৫-এ যোগদানের জন্য ২৬ ও ২৭ মার্চ হাইনান এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকারের আমন্ত্রণে ২৭ থেকে ২৯ মার্চ বেইজিং সফর করেন।

চীনে অবস্থানকালে, গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বেইজিংয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেন। হাইনান প্রদেশে বোয়াও এশিয়া ফোরাম ২০২৫ বার্ষিক সম্মেলনের সময় উপ-প্রধানমন্ত্রী তিং শুয়ে শিয়াং প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বেইজিংয়ে প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট হান জেং সাক্ষাৎ করেন। উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে উভয় পক্ষ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং অভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে গভীরভাবে মতবিনিময় করেছে এবং ব্যাপক ঐকমত্য অর্জন করেছে। প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস বোয়াও এশিয়া ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন ২০২৫-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং একটি বক্তৃতা দেন।

প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে চীন স্বাগত জানায় এবং ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার ও অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে। বাংলাদেশ পক্ষ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে স্বাগত জানানো এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য চীন সরকারকে ধন্যবাদ জানায়। উভয় পক্ষ পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, তারা চীন-বাংলাদেশ ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বকে সমান গুরুত্ব দেয় এবং যৌথভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

 ২. উভয় পক্ষ একমত হয়েছে যে, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ৫০ বছরে, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিবর্তন- নির্বিশেষে দুই দেশের সম্পর্ক সর্বদা সুষ্ঠু ও স্থিতিশীল উন্নয়ন বজায় রেখেছে। উভয় পক্ষ ঐতিহ্যবাহী বন্ধুত্ব অব্যাহত রাখতে, রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা আরও গভীর করতে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচ নীতির ভিত্তিতে উন্নয়ন কৌশলগুলিকে একত্রিত করতে এবং দুই দেশ ও তাদের জনগণের আরও কল্যাণে চীন-বাংলাদেশ ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বকে এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে।

 ৩. উভয় পক্ষ একে অপরের মূল স্বার্থ এবং প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলিতে তাদের পারস্পরিক সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। চীন সর্বদা অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি মেনে চলে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করে, বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন রক্ষায় সমর্থন করে, বাংলাদেশি জনগণের স্বাধীনভাবে নির্বাচিত উন্নয়ন পথকে সম্মান করে এবং বাংলাদেশকে তার জাতীয় অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন পথ অন্বেষণে সমর্থন করে। চীন সর্বদা গোটা বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ এবং বন্ধুত্বের নীতি অনুসরণ করে আসছে। চীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে তার সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা, বাংলাদেশের ঐক্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দেশকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সমর্থন করে।

উভয় পক্ষই জোর দিয়ে বলেছে যে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব নং ২৭৫৮-এর কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। বাংলাদেশি পক্ষ এক-চীন নীতির প্রতি তাদের দৃঢ় আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকার সমগ্র চীনের প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র বৈধ সরকার এবং তাইওয়ান চীনের ভূখণ্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ পক্ষ ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতার’ বিরোধিতা করে। বাংলাদেশ চীনের মূল স্বার্থ সম্পর্কিত বিষয়গুলিতে চীনকে সমর্থন করে এবং তার জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য চীনের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে।

 ৪. উভয় পক্ষ যৌথভাবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নির্মাণে উচ্চমানের সহযোগিতা বৃদ্ধি, শিল্প চেইন এবং সরবরাহ চেইনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও গভীর করতে এবং নিজ নিজ দেশে আধুনিকীকরণ অর্জনের জন্য একসাথে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে চীনের দীর্ঘমেয়াদী দৃঢ় সমর্থনের জন্য বাংলাদেশ কৃতজ্ঞ এবং সেতু, সড়ক, রেলপথ, নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ গ্রিড, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রে চীনের সহযোগিতা প্রকল্পের অর্জিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিধার উচ্চ প্রশংসা করে। চীন বাংলাদেশের জাতীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্পায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সহায়তা অব্যাহত রাখতে ইচ্ছুক। চীন বাংলাদেশের সঙ্গে বস্ত্র ও পোশাক, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃষি, উত্পাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক নীতিমালা এবং বাজারমুখী পদ্ধতিতে বিনিয়োগ সহযোগিতা পরিচালনা করতে চীনা কোম্পানিগুলিকে উত্সাহিত করতে ইচ্ছুক। বাংলাদেশ মংলা বন্দরের আধুনিকীকরণ, সংস্কার ও সম্প্রসারণের মতো প্রকল্পগুলিতে অংশগ্রহণের জন্য চীনা কোম্পানিগুলিকে স্বাগত জানায় এবং চট্টগ্রামে ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প পার্ক’ নির্মাণের জন্য চীনের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক।

 ৫. উভয় পক্ষ জোর দিয়ে বলেছে যে, চীন-বাংলাদেশ অবাধ  বাণিজ্য চুক্তির উপর আলোচনা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু করা উচিত এবং চীন-বাংলাদেশ বিনিয়োগ চুক্তি উন্নয়নের আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা উচিত। উভয় পক্ষ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চীনে বাংলাদেশি তাজা আম এবং অন্যান্য উচ্চমানের কৃষি ও জলজ পণ্য রপ্তানি বাস্তবায়নে সম্মত হয়েছে। চীন আন্তর্জাতিক আমদানি এক্সপো, চীন-দক্ষিণ এশিয়া এক্সপো এবং চীন আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন প্রমোশন এক্সপোর মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চীনের সাথে সহযোগিতা সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশকে স্বাগত জানায় চীন। বাংলাদেশ পক্ষ চীনা কোম্পানিগুলিকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য একটি ভালো পরিবেশ তৈরিতে তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

৬. উভয় পক্ষ জলবিদ্যুৎ সংক্রান্ত প্রতিবেদন, বন্যা প্রতিরোধ ও দুর্যোগ হ্রাস, নদী খনন এবং সমন্বিত জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলসম্পদ উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে এবং বন্যার মৌসুমে ইয়ারলুং জাংবো নদী-ব্রহ্মপুত্র নদী-যমুনা নদীর জলবিদ্যুৎ সংক্রান্ত তথ্য পারস্পরিক সরবরাহের বিষয়ে উভয় দেশের স্বাক্ষরিত বাস্তবায়ন পরিকল্পনার ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছে। তিস্তা নদীর ব্যাপক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশ চীনা কোম্পানিগুলিকে স্বাগত জানায়। উভয় পক্ষ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যৌথভাবে কাজ করতে এবং নীল অর্থনীতির সহযোগিতার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সম্মত হয়েছে। উভয় পক্ষ সামুদ্রিক বিষয়ে বিনিময় জোরদার করতে এবং উপযুক্ত সময়ে সামুদ্রিক সহযোগিতা সংলাপের একটি নতুন দফা আয়োজনে সম্মত হয়েছে।

৭. উভয় পক্ষ ২০২৫ সালে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫০তম বার্ষিকী এবং ‘চীন-বাংলাদেশ জনগণ ও সংস্কৃতি বিনিময় বর্ষ’ যৌথভাবে উদযাপন করতে, সংস্কৃতি, পর্যটন, মিডিয়া, শিক্ষা, চিকিত্সা সেবা, যুব, স্থানীয় সরকার, থিংক ট্যাংক ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিনিময় ও সহযোগিতা আরও গভীর করতে এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি করতে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশি রোগীদের চিকিত্সার জন্য চীনের ইউননান প্রদেশে ভ্রমণের সুবিধা প্রদানের জন্য বাংলাদেশি পক্ষ চীনকে ধন্যবাদ জানায়।

 ৮. বাংলাদেশ মানবজাতির জন্য একটি অভিন্ন ভবিষ্যৎ কমিউনিটি গড়ে তোলার ধারণার প্রশংসা করেছে এবং বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন উদ্যোগের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ পক্ষ প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং প্রস্তাবিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ এবং বৈশ্বিক সভ্যতা উদ্যোগের গুরুত্ব উল্লেখ করেছে। উভয় পক্ষ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা, গ্লোবাল সাউথের মধ্যে ঐক্য ও স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি করা এবং যৌথভাবে বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সম্মত হয়েছে।

 ৯. উভয় পক্ষই জোর দিয়ে বলেছে যে, ২০২৫ সাল- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি এবং জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৮০তম বার্ষিকী। উভয় পক্ষ জাতিসংঘ সনদের উদ্দেশ্য এবং নীতির প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে, প্রকৃত বহুপাক্ষিকতা অনুশীলন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গণতন্ত্রীকরণকে উত্সাহিত করেছে। উভয় পক্ষ যৌথভাবে বিশ্বের সমান ও সুশৃঙ্খল বহুমেরুকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের পক্ষে কথা বলবে। উভয় পক্ষ উন্নয়নশীল দেশগুলির সাধারণ স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার যৌথভাবে রক্ষার জন্য জাতিসংঘ ও অন্যান্য বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার অধীনে সমন্বয় ও সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে।

 ১০. মিয়ানমারে শান্তি ও সংলাপ প্রচারে চীনের প্রচেষ্টা এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের সমস্যা সমাধানে গঠনমূলক ভূমিকার জন্য বাংলাদেশ প্রশংসা করে। রাখাইন রাজ্যের সংঘাত থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের জন্য বাংলাদেশের মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য চীন কৃতজ্ঞ। বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজতে চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে সমর্থন জানায়। প্রত্যাবাসনে উত্সাহিত করার জন্য চীন তার সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা দিতে চায়।

১১. সফরে উভয় পক্ষ দুই সরকারের মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং ক্লাসিক রচনাগুলির পারস্পরিক অনুবাদ ও প্রকাশনা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিনিময় ও সহযোগিতা, সংবাদ বিনিময় এবং মিডিয়া, ক্রীড়া ও চিকিত্সা ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি নথি স্বাক্ষর করেছে।

 ১২. প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং চীনা জনগণকে তাঁর ও বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের প্রতি উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ অভ্যর্থনার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান এবং উভয় পক্ষের জন্য সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের জন্য চীনা নেতাদের আমন্ত্রণ জানান।

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের